Also read in

চিকিৎসার সঙ্গে ক্রীড়াজগতেও বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন শিলচরের তিন স্পোর্টস লাভার ডা: সিদ্ধার্থ, ডা: প্রিয়ঙ্কা ও ডা: সামসুর

আমাদের সমাজে চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে জড়িতদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়ে থাকে। স্বামী বিবেকানন্দ ও বলেছিলেন, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। আমাদের সমাজে একজন চিকিৎসককে ঈশ্বর হিসেবেই দেখা হয়। আর মহামারী করোনা ভাইরাস এর সৌজন্যে তো এই কথাটা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে। করোনা কালে স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্তরা দিনরাত এক করে মানুষের সেবা শুশ্রূষা করেছেন। ‌ লকডাউন থাকাকালীন যখন গোটা দেশ গৃহবন্দি ছিল, চিকিৎসকরা কিন্তু তখনও চরম পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। এখনও দিচ্ছেন।

করোনার সময় চিকিৎসক, নার্সদের ও নিভৃতবাসে থেকে কাজ করতে হয়েছে। অনেকের তো হাসপাতালই বাড়িঘর হয়ে গিয়েছিল। অনেক চিকিৎসক আবার যখন দরকার পড়েছে, হাসপাতাল অথবা নার্সিংহোমে ছুটে গেছেন। সেই সঙ্গে ঘর থেকেই রোগীদের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। সোজা কথায়, আমাদের জীবনে একজন চিকিৎসকের গুরুত্ব কতটুকু, সেটা মহামারি করোনা ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে। শহর শিলচরের ও এমন তিনজন চিকিৎসক রয়েছেন যারা করোনাকালে বিভিন্নভাবে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। যখনই দরকার হয়েছে, হাসপাতাল অথবা নার্সিংহোমে ছুটে গিয়েছেন। প্রয়োজনে ঘর থেকেও রোগীদের পরামর্শ দিয়েছেন। এই তিনজন চিকিৎসক হলেন, ডা: সিদ্ধার্থ শংকর ভট্টাচার্য্য (শল্য চিকিৎসক, শিলচর মেডিকেল কলেজের সার্জারি প্রফেসর), ডা: প্রিয়ঙ্কা দেব (চাইল্ড স্পেশালিস্ট) এবং ডা: সামসুর রহমান (অস্থি রোগ বিশেষজ্ঞ)। তবে এই তিনজন শুধু চিকিৎসা পরিষেবায় নন, স্থানীয় ক্রীড়াজগতেও বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন।

ডা: সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি (প্রশাসন) পদে রয়েছেন। সংস্থায় সাংবিধানিক সহ অন্য কোনও সমস্যা হলেই সবার প্রিয় ‘সিদ্ধার্থ দা’ তার সমাধানে এগিয়ে আসেন। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা করতে ভালোবাসেন তিনি। স্কুলে পড়ার সময় স্কুল লীগে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলেছেন। সেইসঙ্গে শিলচরের সব ধরনের ইনডোর গেমসেও চুটিয়ে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ইনডোর গেমসে সিদ্ধার্থ বাবুর ফেবারিট ছিল টেবিল টেনিস। ছোটবেলা থেকে সময় পেলেই ডি এস এ মাঠে আসতেন। ডি এস এর পাশেই বাড়ি থাকায় এটা তার জন্য ছিল মস্ত বড় অ্যাডভান্টেজ।

এখনও কিন্তু মাঠের প্রতি তাঁর সেই টান রয়ে গেছে। তাই তো প্রতিদিন সকালে প্যাক্ট শিডিউলের মধ্যেও শিলচর টেনিস ক্লাবে রেকেট হাতে এক-দেড়ঘন্টা সময় কাটান। তারপর সেখান থেকে সাড়ে আটটা নাগাদ ছুটে যান শিলচর মেডিকেল কলেজে। সন্ধ্যায় জিমে একঘন্টা ওয়ার্কআউট ও করেন। সময় কাটান রোটারি ক্লাব এবং শিলচর ডিএসএতেও। শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থা যখনই কোনো বড় ম্যাচের আয়োজন করেছে, তাতে মেডিকেল টিমের কনভেনার এর দায়িত্বে থাকেন ড: সিদ্ধার্থ। ১৯৯২ সাল থেকে এটা চলে আসছে। সি কে নাইডু ট্রফির ম্যাচ হোক, অথবা আন্তঃজেলা ক্রিকেটের কোনো ম্যাচ, সিদ্ধার্থ বাবুই মেডিকেল টিমের দায়িত্ব সামলেছেন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক ম্যারাথনের আয়োজন করেছিল শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থা। তবে ম্যারাথন আয়োজন করে নিলেও একজন চিকিৎসকের খোঁজ পাচ্ছিল না সংস্থা। ডি এস এর নিজস্ব এম্বুলেন্স থাকলেও তার ড্রাইভার ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন ‘ক্রাইসিস ম্যান’ ডা: সিদ্ধার্থ। তিনি এবং তার ছেলে এম্বুলেন্স চালিয়ে সংস্থার সমস্যার সমাধান করেন। এখানেই শেষ নয়, করোনাকালে জেলার তিন রনজি তারকা প্রীতম দাস, অভিষেক ঠাকুরি এবং রাহুল সিং কে ৬-৭বার অসম ক্রিকেট সংস্থার ক্যাম্পে যেতে হয়েছে। আর এই তিন তারকা যতবারই এ সি এর ক্যাম্পে যোগ দিয়েছেন তাদের আর টি পি সি আর টেস্ট এর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সিদ্ধার্থ বাবু। আন্তঃজেলা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাওয়া শিলচরের প্রতিটি দলের সদস্যদের করোনা টেস্ট সহ কোনো চিকিৎসার দরকার হলেই এগিয়ে এসেছেন। তিনি জড়িয়ে আছেন শিলচর ভেটেরন ক্রিকেটার্স ক্লাবের সঙ্গে ও। বিভিন্ন সময়ে তাদের ও বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন।

স্থানীয় ক্রীড়া জগতে এক বিশেষ নাম হচ্ছে পঙ্কজ কুমার দেব। শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থার পরিকাঠামোগত উন্নয়নে প্রয়াত পঙ্কজ কুমার দেবের বিরাট অবদান ছিল। এন ই সির কার্যনির্বাহী বাস্তুকার থাকাকালীন (পরবর্তীতে অ্যাডভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পান) ডি এস এর ফুটবল প্যাভিলিয়ন, ক্রিকেট প্যাভিলিয়ন এবং সুইমিং পুলের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন ক্রীড়াপ্রেমী পঙ্কজ কুমার দেব। এবার তার সেই ‘লেগেসি’ কে এগিয়ে নিয়ে যেতে মাঠে নেমেছেন পংকজ দেবের মেয়ে ডা: প্রিয়ঙ্কা দেব।

আমাদের এই অঞ্চলে তেমন কোনো কর্পোরেট হাউজ নেই। ফলে শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থা কে আর্থিক অনুদানের জন্য সরকারের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। পরিকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে কোন টুর্নামেন্টে স্পন্সরশীপের জন্য এদিক-ওদিক ছুটতে হয় সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের। অনেকেরই ক্ষমতা থাকলেও মাঠে-ময়দানে এগিয়ে আসেন না। এই দিক থেকে ব্যতিক্রমী ডা: প্রিয়ঙ্কা। স্থানীয় ক্রীড়ার উন্নতিতে একজন স্পন্সরের ভূমিকাটাও কিন্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। স্পনসরশিপ না হলে কোনো কিছুরই উন্নতি হবে না। ‌ স্পোর্টস ব্যাকগ্রাউন্ড থাকায় এই বিষয়টা ভালো করেই জানেন ডা: প্রিয়ঙ্কা। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে খেলাধুলার একটা পরিবেশ ছিল। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচ হলে তো কথাই নেই। পিতা পংকজ দেব শুধু একজন ক্রীড়াপ্রেমী ছিলেন না, খুব ভালো ফুটবল ও খেলতেন। তাই খেলার প্রতি ছোটবেলা থেকেই এক বিশেষ টানছিল ডা: প্রিয়ঙ্কার।
এই করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ছোট বাচ্চাদের। প্রায় দু’বছর গৃহবন্দি থাকার ফলে অনেক বাচ্চারই মানসিকভাবে একঘেয়ে হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার থার্ড ওয়েবে শিশুদের সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি হবে। ‌ সমাজের প্রত্যেকটা মানুষকেই এই আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এখন তো কচিকাচাদের জীবনটা মোবাইলেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। ‌ এটা কিন্তু মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এমন একটা প্রেক্ষাপটে একজন চিকিৎসক হিসেবে ডা: প্রিয়ঙ্কার কাজটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কঠিন চ্যালেঞ্জের মাঝেও নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি। রোজই রোগী দেখছেন। অভিভাবকদের নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। এই মুহূর্তে ছোট বাচ্চাদের জন্য ‘আউটডোর অ্যাক্টিভিটি’ যে কতটা জরুরি, সেটাও বলছেন। সেই সঙ্গেই একজন চিকিৎসক হিসেবে যে তার ফিট থাকাটাও জরুরী, সেটাও ভালো করে জানেন। তাইতো রোজ জিম করেন। সঙ্গে বক্সিং ও।

চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গেই মাঠে ময়দানেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন ডা: প্রিয়ঙ্কা। তার স্পনসরশিপেই শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রশাসনিক ভবনের ভোল পাল্টে গেছে। সংস্থার সচিব ও সভাপতির পক্ষ ছাড়াও কোষাধ্যক্ষ কাম অফিস রুম এবং এ জি এসদের রুম নতুন করে সেজে উঠেছে। সংস্থার পুরো প্রশাসনিক ভবনের নতুন করে নির্মাণের পুরো টাকাটাই বহন করেছেন ডা: প্রিয়ঙ্কা। তার প্রয়াতঃ পিতা পংকজ দেবের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে সংস্থার প্রশাসনিক ভবন। যা হার মানাবে কোনো কর্পোরেট অফিস কেও।খেলাধুলার প্রতি টান রয়েছে বলেই প্রশাসনিক ভবন নতুন করে নির্মাণের প্রস্তাব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা লুফে নেন ডা প্রিয়ঙ্কা।

স্থানীয় ক্রীড়া জগতে বিশেষ অবদান রাখছেন ডা: সামসুর রহমান ও। একজন সফল ক্রিকেটারের সঙ্গে তিনি খুব ভালো অ্যাথলিট ও। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলো করছেন। আন্তঃকলেজ ক্রিকেটে একবার টুর্নামেন্ট সেরা ক্রিকেটারের সম্মান পেয়েছিলেন। এছাড়া শিলচর মেডিকেল কলেজের অ্যাথলেটিকস মিটে একাধিকবার সেরা অ্যাথলিটের সম্মান পেয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এখনো চুটিয়ে ক্রিকেট খেলেন ডা: সামসুর। ইলেভেন স্টার নামে তার নিজস্ব একটি ক্লাব রয়েছে। ‌ শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রথম বিভাগীয় ক্লাব ক্রিকেট খেলে থাকে এই ইলেভেন স্টার। এতে উঠতি খেলোয়াড় দের সুযোগ করে দেন ডা: সামসুর। এছাড়াও যখনই কারোর দরকার পড়ে, সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন তিনি। ঠিক এভাবেই সম্প্রতি তিনি এগিয়ে আসেন প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রকাশ ভগতের সাহায্যার্থে।

টানা কয়েক বছর রাজ্য দলের প্রতিনিধিত্ব করে একটা চাকরি জুটেনি প্রকাশের। ‌ আর্থিক অভাবে তাকে বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে রাস্তার পাশে ডাল পুরির ছোট্ট দোকান চালাতে হচ্ছিল। বরাক বুলেটিনের পক্ষে এই প্রতিবেদকই প্রথম প্রকাশের করুন কাহিনী সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। এরপরও প্রকাশ কে নিয়ে তিন-চারটে স্টরি করেছিল বরাক বুলেটিন। দু লক্ষ টাকার আর্থিক অনুদান পেলেও চাকরি আর জোটেনি প্রকাশের। ‌ এমন সময় এগিয়ে আসেন ডা: সামসুর। শিলচর নাগাটিলায় তার সুইমিং ক্লাব এর কেয়ারটেকার হিসেবে চাকরি দেন প্রকাশকে। এভাবেই বিভিন্ন সময়ে সমাজে বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন ডা: সামসুর। ডি এস এর প্রথম বিভাগীয় ক্রিকেট ধারাবাহিক পারফর্মার তিনি। স্পোর্টস কে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিলে আজ হয়তো একজন সফল ক্রিকেটারই হতেন। তবে তিনি বেছে নেন চিকিৎসা পরিষেবার মত এক মহৎ কাজকে। এর সঙ্গেই মাঠে ময়দানে ও অবদান রেখে চলেছেন।

Comments are closed.