Also read in

সাগরিকা রিজেন্সি নিয়ম ভেঙেছে জানতেন নিহার ঠাকুর! শোকজ করলেও কড়া পদক্ষেপ নেননি পুরপতি

সুব্রত মজুমদার সহ ছয় ব্যক্তি গৌহাটি হাইকোর্টে শিলচরের শ্যামাপ্রসাদ রোডের সাগরিকা রিজেন্সির নির্মাণ নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। এব্যাপারে তদন্ত হয় এবং শেষমেষ পরিষ্কার হয়, অনুমতি ছাড়াই একটি অতিরিক্ত ফ্লোর বানিয়েছে সাগরিকা রিজেন্সি। প্রথমে শিলচর পৌরসভার বর্তমান সিইও সুমিত সত্যওয়ানকে এব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ১৯ অক্টোবর শেষ রায়ে কাছাড়ের জেলাশাসক কীর্তি জল্লিকে অতিসত্বর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে গৌহাটি হাইকোর্ট। তবে শিলচর পৌরসভা আগে থেকেই জানতেন বিল্ডিং বানানোর ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। তৎকালীন পুরপতি নিহারেন্দ্র নারায়ণ ঠাকুর দু-দুবার শোকজ করেছেন কিন্তু নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনও কড়া পদক্ষেপ নেননি।

এদিকে সাগরিকা রিজেন্সির কর্ণধার বিশ্বজিৎ রায় মনে করেন তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত হচ্ছে। কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া এক নেতার ছেলে ইচ্ছাকৃতভাবে তার পেছনে লাগার চেষ্টা করছেন। তিনি সরকার পক্ষের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তার ব্যবসা নষ্ট করে দিতে চাইছেন।

সাগরিকা রিজেন্সির কর্ণধার বিশ্বজিৎ রায় ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ বিল্ডিং বানানোর ড্রয়িং সহ অনুমতির জন্য আবেদন করেছিলেন। ৩ জুলাই শিলচর পৌরসভার তরফে অনুমতি দেওয়া হয়। বলা হয় বিল্ডিংয়ের বেসমেন্ট থাকবে, গ্রাউন্ড ফ্লোর ছাড়া চারটি ফ্লোর থাকবে।

এনওসিতে লেখা রয়েছে, ‘সম্পত্তির মালিক যখন বিল্ডিং বানানোর কাজ শুরু করবেন, তিনি সেই খবর শিলচর পুরসভাকে দেবেন। কাজ শুরু হওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে পৌরসভার পক্ষ থেকে এলাকা পরিদর্শন করা হবে এবং সবগুলো নিয়ম পালন করা হচ্ছে কিনা এব্যাপারে রিপোর্ট বানাবো হবে।’
এই এনওসিতে স্বাক্ষর করেছেন প্রাক্তন পুরপতি নিহারেন্দ্র নারায়ণ ঠাকুর এবং টাউন এন্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর।

তবে পুরসভার পক্ষ থেকে গৌহাটি হাইকোর্টের দেওয়া বয়ান অনুযায়ী, বিশ্বজিৎ রায় বিল্ডিং বানানোর কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে শিলচর পৌরসভার কাছে কোনও খবর পাঠাননি। ফলে, বোর্ডের পক্ষ থেকে জানা সম্ভব হয়নি কবে কাজ শুরু হয়েছে এবং কবে শেষ হয়েছে।

২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিশ্বজিৎ রায় শিলচর পৌরসভার কাছে অকুপেন্সি সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেন। তৎকালীন পুরপতি নিহারেন্দ্র নারায়ণ ঠাকুরের মতে, এনওসি পাওয়ার পর এই প্রথমবার বিশ্বজিৎ রায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই সময়ের মধ্যে পুরো বিল্ডিং বানানো হয়ে গেছে, অথচ পৌরসভা এব্যাপারে জানেনা। তবে যে ড্রয়িং দেখিয়ে বিল্ডিং বানানো হয়েছিল তার থেকে অতিরিক্ত ফ্লোর গড়ে উঠেছে এটা শিলচর পুরসভা জানতো। এছাড়া শহরের মধ্যে এত বড় একটি বিল্ডিং বানানো হচ্ছে, এতে সব ধরনের নিয়ম পালন করা হচ্ছে কিনা এটা নিয়ে পুরসভা নিজেদের পক্ষ থেকে কোনও তদন্ত করেনি। অভিযোগ থাকলেও পরবর্তীতে এই বিল্ডিংয়ের উপরে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তীতে শিলচর পুরসভার তরফে একটি তদন্ত করা হয়, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে জমা দেওয়া রিপোর্টে বলা হয়, কয়েকটি ছোটখাটো নিয়ম ভাঙা হয়, পাশাপাশি পুরো একটি ফ্লোর পারমিশন ছাড়া গড়ে তোলা হয়েছে।

পুরপতি নিহারেন্দ্র নারায়ণ ঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজিৎ রায়ের উদ্দেশ্যে একটি শোকজ নোটিশ পাঠান। এতে বিশ্বজিৎ রায় যে উত্তর দেন সেটা তার পছন্দ হয়নি। তিনি আবার একটু শোকজ নোটিশ পাঠান। তবে এর কোনো উত্তর আসেনি এবং পুরসভার পক্ষ থেকে সাগরিকা রিজেন্সির বিরুদ্ধে কোনও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কেন এমনটা করলেন নিহারেন্দ্র নারায়ন ঠাকুর? এর উত্তরে তিনি বলেন, “বারবার আমার দিকে আঙুল না তুলে আপনারা জেলা প্রশাসনের কাছেও প্রশ্ন করুন। এনওসি প্রদানের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পুরসভা সিদ্ধান্ত নেয়নি, সঙ্গে টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং বিভাগ ছিল। যদি ভুল হয়ে থাকে তার দায় যতটুকু আমাদের, ততটুকু জেলাশাসকেরও।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা বিশ্বজিৎ রায়কে শোকজ করেছিলাম, তার উত্তর সঠিক না হওয়ায় পুনরায় শোকজ করা হয়। এখন আমরা পুরসভায় নেই। সবগুলো ফাইল আমার কাছে নয় যে আমি স্পষ্ট উত্তর দিতে পারব। তবে এটুকু বলতে পারি আমরা বারবার চেষ্টা করেছি। তিনি ট্রেড লাইসেন্স চাইলে আমরা সেটা দিইনি। তবে আমাদের বাইরে আরও বিভাগ রয়েছে যারা এসব সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সাগরিকা রিজেন্সির সঙ্গে একই বিল্ডিংয়ে টাটা ওয়েস্টসাইডের রিটেল দোকান রয়েছে। আমার ধারণা তারা বেশ কিছু অংশ লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবহার করছেন। তবে এই মুহূর্তে আমাদের হাতে কোন ক্ষমতা নেই, যা করার জেলা প্রশাসন করবে।”

১৯ অক্টোবর গৌহাটি হাইকোর্ট সরাসরি কাছাড়ের জেলাশাসককে নির্দেশ দিয়েছে এব্যাপারে পর্যাপ্ত তদন্ত করে অতি সত্বর কড়া পদক্ষেপ নিতে। জানা গেছে, জেলাশাসক কীর্তি জল্লি নতুন করে পুরো ব্যাপারে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ৫ নভেম্বর হাইকোর্ট তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। এর আগে জেলাশাসক কি তদন্ত করেন, তার রিপোর্টে কি উঠে আসে এবং পরবর্তীতে হাইকোর্ট কী নির্দেশ দেন এটা এখন দেখার বিষয়।

সাগরিকা রিজেন্সির কর্ণধার বিশ্বজিৎ রায় মনে করেন, তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত চলছে। এক প্রাক্তন কংগ্রেস মন্ত্রী যিনি সদ্য বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন তার ছেলে কাজগুলো করাচ্ছেন। যারা হাইকোর্টে মামলা করেছে তাদের প্রায় প্রত্যেকেই সেই মন্ত্রীর ছেলের অধীনে কাজ করেন। মামলা হওয়ার আগে সেই মন্ত্রীর ছেলে শিলচর পুরসভার কাছ থেকে সাগরিকা রিজেন্সির সম্পূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এর পেছনে হয়তো কোনও ব্যবসায়িক শত্রুতা রয়েছে, কারণ সেই মন্ত্রীর ছেলের শিলচর শহরে একটি হোটেল রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা যেটুকু জায়গা ছেড়ে হোটেল বানিয়েছি এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। আমাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হলে শিলচর শহরের প্রত্যেক দোকানের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত। আমার ধারনা অন্তত ২০০ দোকানের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হবে। এমনকি পার্ক রোডে থাকা সেই মন্ত্রীর ছেলের হোটেল এর আওতায় পড়বে। যদি তদন্ত হয় তাহলে সবার বিরুদ্ধে হোক, শুধু আমাদের টার্গেট করলে চলবে না।

Comments are closed.