Also read in

দুই দিনের মধ্যেই বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন রাজদীপ গোয়ালা, "এবার রাজনীতির মাঠেই দেখা হবে আজমলপন্থী কংগ্রেসের সঙ্গে"

যেদিন তরুণ গগৈ বদরুদ্দিন আজমলের হাত ধরেছিলেন, সেদিনই ঠিক করে নিয়েছিলাম আর এই দলে থাকা যাবে না। আমার বাবা কংগ্রেস দলের জন্য সারাটা জীবন দিয়েছেন, তবে কোনদিন যোগ্য সম্মান পাননি, এমনকি তার মৃত্যুর পরও তাকে সম্মান দেয়নি কংগ্রেস দল। যে আদর্শের জন্য আমরা কংগ্রেসে ছিলাম সেটা এখন আর নেই। বলা যায়, কংগ্রেস দল এখন একটি বেসরকারি কোম্পানির মত হয়ে গেছে যেখানে কোন নিজস্ব আদর্শ নেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানতেন আমি কংগ্রেস দলের নানান সিদ্ধান্তে খুশি নই, তাই তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেন। একসময় হয়ত নিজেই দল ছাড়তাম, তাই এই বহিষ্কারে খুব একটা হতাশ হচ্ছিনা। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সহ বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে, আগামী দুই দিনের মধ্যেই দলে যোগ দিচ্ছি। কোনও শর্ত রেখে নয়, দলের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে যোগ দেব, এমনটাই জানিয়েছেন সদ্য কংগ্রেস দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা।

প্রঃ- কংগ্রেস দল থেকে বহিষ্কার কেন, কি মনে হয় আপনার?

উঃ- আমার বাবা সারাটা জীবন যে দলের জন্য এতটা করেছেন তাকে দল ন্যূনতম সম্মান জানায়নি। বাবার জন্মদিন বা মৃত্যুদিনে পর্যন্ত তাকে স্মরণ করে না আসাম প্রদেশ কংগ্রেস। হিমন্তবিশ্ব শর্মা আমার বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা করার পর হঠাৎ করে যুব কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এসব ব্যাপারে কিছুটা দৌড়ঝাঁপ দেখা গেলেও, সেটা নামমাত্র ছিল। কংগ্রেস দল এখন আর আদর্শ নিয়ে চলা একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, বরং একটি বেসরকারি কোম্পানির মত হয়ে গেছে। কেন আমাকে বহিষ্কার করা হল এটা তো বলাই হয়নি, এমনকি বহিষ্কারের নির্দেশটুকু সরাসরি আমার কাছে না পাঠিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এতেই বোঝা যায় দলের নিয়মানুবর্তিতা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রঃ- বলা হয়েছে আপনি অনেকদিন ধরেই কংগ্রেস দলের কার্যকলাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখছিলেন, এটা কি সত্য?

উঃ- প্রথম মতবিরোধ শুরু হয় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে। যখন এটি বিলের পর্যায়ে ছিল, আমরা সমর্থন করেছি, জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটির কাছে লিখিতভাবে সমর্থনের কথা জানিয়েছি। অথচ রাজ্যস্তরে কংগ্রেস দল এর বিরোধিতা করেছে। একই দলের দুই ধরনের মনোবৃত্তি হলে সহাবস্থান হয়না। এছাড়া বদরুদ্দিন আজমলের সঙ্গে দলের সখ্যতা আমার পছন্দ হয়নি। রাজ্য কংগ্রেস যত বেশি আজমলের কাছাকাছি গেছে আমার মত অনেকেই হতাশ হয়ে সরে এসেছেন। আমরা প্রকাশ্যে বলিনি বা বলার সুযোগ পাইনি। এবার আর বলার কোনও প্রয়োজন থাকলনা, কেননা তারাই আমাকে বহিষ্কার করেছেন। তবে আমি কংগ্রেস দলের কার্যকলাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি এটা বলা ভুল হবে। তারাই আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন।

প্রঃ- প্রয়াত দীনেশ গোয়ালার সন্তানকে কংগ্রেস থেকে বহিস্কার করার সিদ্ধান্ত আপনার কাছে কতটুকু অপমানজনক মনে হয়েছে?

উঃ- শুনলাম জেলা কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আমি দলের আদর্শ মেনে চলছি না, তাই বহিষ্কার করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কংগ্রেস দল মীরা কুমারকে সমর্থন করেছিল, সেই সময় আমাদের রাজ্যের কংগ্রেস সাংসদ রানি নরহ ভোট না দিয়ে বিজেপির পছন্দের প্রার্থীকে জয়ী হওয়াতে সাহায্য করেছিলেন। তখন তাকে কেন বহিষ্কার করলেন না প্রদেশ কংগ্রেস বা এআইসিসি? আমাদের বেলায় আদর্শের কথা বলা, আর অন্যদের বেলায় চুপ থেকে দল নিজের অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছে।

আর যেখানে আমার বাবার কথা, কংগ্রেস দল কোনদিনই তাকে সম্মান জানায়নি। শুধুমাত্র বরাক উপত্যকা নয় রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি দলের প্রচার করেছেন, সারা জীবন একান্ত অনুগত থেকেছেন। অথচ আজকাল অনেক তরুণ নেতাই তার অবদান স্বীকার করতে চাননা। এব্যাপারে আমার কিছু বলার কোনও প্রয়োজন নেই, কেননা তাদের বুঝিয়ে লাভ হবে না। আঘাতের পর আঘাত পেতে পেতে ধীরে ধীরে সরে এসেছি।

প্রঃ- এআইইউডিএফের সঙ্গে কংগ্রেসের আঁতাত হলে আপনার আপত্তিটা কোথায় ছিল?

উঃ- প্রথম থেকেই আমরা এই আঁতাতের বিরুদ্ধে ছিলাম। শেষমেষ যখন তরুণ গগৈ বদরুদ্দিন আজমলের হাত ধরে পছন্দের রাজ্যসভার প্রার্থী মনোনয়ন দিতে গেলেন, তখন আমাদের আর জায়গা বাকি ছিল না। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে অঘোষিতভাবে কংগ্রেস দলের সাহায্য করেছেন বদরুদ্দিন আজমল। তিনি শিলচরে প্রার্থী না দিয়ে তরুণ গগৈ’র সঙ্গে সখ্যতা বজায় রেখেছিলেন। ভারতবর্ষের সবথেকে পুরনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেস, সেই দলকে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য এতটা নিচে নেমে যেতে হবে, এটা আমাদের ভালো লাগেনি। বাবার কাছ থেকে রাজনীতির আদর্শ পেয়েছি, জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করছি। তবে আমার কাছে প্রথম প্রাধান্য আমার নিজের এলাকার মানুষ এবং তাদের স্বার্থ। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য এটুকু ভুলে গেলে চলেনা।

প্রঃ- হিমন্তের ঘোষণা এবং বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে কি ভাবছেন?

উঃ- স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার সঙ্গে কথা হয়েছে, অতিসত্বর বিজেপিতে যোগ দিচ্ছি। তিনি প্রথম থেকেই জানতেন আমি কংগ্রেস দলের সঙ্গে এআইইউডিএফের আঁতাতের বিরুদ্ধে ছিলাম। কয়েকবার এব্যাপারে কথা হয়েছে। এবার যখন কংগ্রেস দল নিজে থেকেই আমার সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছেদ করেছে, তখন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার রয়েছে। গত কয়েক বছরে বিজেপি আমাদের এলাকার জন্য যতটুকু কাজ করেছে সেটা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। আমি মনে করি তাদের সঙ্গে মিলে এলাকার উন্নতির জন্য অনেক বেশি কাজ করতে পারব।

প্রঃ- তবে কি আগামী বছর নির্বাচনে লক্ষীপুরের বিজেপির প্রার্থী আপনিই হচ্ছেন?

উঃ- আমি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে কোনও শর্ত রাখিনি। দলের একটি অনুশাসন রয়েছে সেই অনুযায়ী তারা প্রার্থী বাছাই করবেন। যদি মনে করেন আমাকে প্রার্থী করবেন তাতেও খুশি, যদি না হয় সেটা নিয়ে মন খারাপ করবো না।

শুক্রবার কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় কমিটি রাজদীপ গোয়ালাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। এআইসিসি’র সাধারণ সম্পাদক কেসি ভেনুগোপাল চিঠি লিখে খবরটি জানিয়েছেন। প্রাক্তন মন্ত্রী প্রয়াত দীনেশ প্রসাদ গোয়ালার জ্যেষ্ঠপুত্র রাজদীপ গোয়ালা ২০১৪ সালে উপনির্বাচনে প্রথমবারের মতো জয়ী হন। তৎকালীন কংগ্রেস নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বরাবরই ছিল। ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে কাছাড় জেলার একমাত্র কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে বিধায়ক হন। বিজেপির শাসনকালে কংগ্রেস দলের অন্যান্য বিধায়করা সরকারের বিভিন্ন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সরব হলেও তাকে খুব একটা মুখ খুলতে দেখা যায়নি। ২০১৯ সালে সুস্মিতা দেব লোকসভা নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও পাল্টে যায়।

এই বছর মার্চ মাসে হিমন্তবিশ্ব শর্মা হঠাৎ করেই ঘোষণা করেন রাজদীপ গোয়ালা সহ কংগ্রেস দলের এক মহিলা নেতা বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। এবার পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হওয়াতে আরো কিছু প্রশ্ন মাথাচাড়া দিচ্ছে। দলের প্রভাবশালী নেতা কৌশিক রাই লক্ষীপুর থেকে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে সব থেকে এগিয়ে রয়েছেন। এবার রাজদীপ গোয়ালা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার হাত ধরে গেরুয়াপন্থী হওয়ায় দেখার বিষয় হবে লক্ষীপুর বিধানসভা সমষ্টিতে বিজেপির প্রার্থী কাকে বেছে নেওয়া হয়।

Comments are closed.