Also read in

Heart specialist Dr. Nabajit Talukdar says one Medical College not enough for adequate healthcare

শুধুমাত্র শিলচর মেডিক্যালকে ঘিরে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়, বলছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ নবজিৎ তালুকদার

বরাক উপত্যকার সবথেকে বেশি ভরসাযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্র হচ্ছে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। তবে এই সরকারি হাসপাতালে হৃদরোগ থেকে শুরু করে বেশ কিছু বড় বড় সমস্যার জন্য ন্যূনতম পরিষেবাও নেই। বারবার দেশ-বিদেশের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আসছেন বলে খবর বেরোয়, কেউ কেউ দু’একদিনের জন্য আসেনও, কিন্তু পাকাপাকি কোনও ব্যবস্থা হয় না। এই হাসপাতালের প্রাক্তনী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ নবজিৎ তালুকদার মনে করেন শুধুমাত্র সরকারি হাসপাতালকে ঘিরে শিলচরের মত জনবহুল শহরের পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। দিল্লিতে দেশের অন্যতম সেরা বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করছেন তিনি, তবু নিজের শহরের খবর রাখেন। শিলচরের ছেলে সায়ন্তন হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। অথচ একই সমস্যায় হাসপাতালে গিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। এই দুই ঘটনার তুলনা এজন্য হচ্ছে, কারণ পর্যাপ্ত পরিকাঠামো থাকায় একজনের প্রাণ বাঁচানো গেছে এবং অন্যজন মারা গেছেন।

ডাঃ নবজিৎ তালুকদার বলেন, “সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সহ ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও একটা কথা প্রযোজ্য, শুধুমাত্র সরকারি পরিকাঠামো দিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির সম্ভব নয়। দশবছর আগে গুয়াহাটির অবস্থাও শিলচরের মতই ছিল, এক দশকে শুধুমাত্র বেসরকারি ক্ষেত্রে উন্নতির ফলে পুরো পরিকাঠামো বদলে গেছে। এখন গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজের অবস্থাও আগের থেকে অনেক বেশি উন্নত। হৃদরোগের কথা উঠলেই একটা বিশেষ মুহূর্তের কথা আমরা খুব বেশি বলি, সেটা হচ্ছে ‘গোল্ডেন আওয়ার’। কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে চিকিৎসার টেবিলে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক সেকেন্ড মূল্যবান থাকে। তবে অন্যান্য শহরে বিভিন্ন এলাকায় এমন পরিকাঠামো রয়েছে যেখানে রোগীকে থ্রম্বোলাইসিস দিয়ে রক্তের ক্লট ছাড়ানোর ব্যবস্থা করা যায়, এতে রোগীকে বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। ধরুন শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সব ধরনের উন্নত পরিষেবা রয়েছে এবং শহরের মালুগ্রাম এলাকায় একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গোল্ডেন আওয়ারে রয়েছেন। তাকে থ্রম্বোসিস করানোর জন্য মেডিক্যাল নিয়ে যাওয়ার আগেই হয়তো দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। আমাদের যেটা করতে হবে, মালুগ্রাম এলাকার আশেপাশে যেসব বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে সেখানে হৃদরোগের এই ছোটখাটো চিকিৎসাগুলো প্রত্যেক কর্মীকে শিখিয়ে দিতে হবে। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা করে রোগীকে চরম বিপদ থেকে বাঁচিয়ে নেবে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে পাঠানো যাবে। এরকম আরও উদাহরণ দিয়ে আমি দেখিয়ে দিতে পারব শুধুমাত্র সরকারি হাসপাতালগুলোর উপর নির্ভর করে আমরা বড় দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে পারব না।”

শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ চিকিৎসা বিভাগের পক্ষ থেকে একসময় তাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কোনও বিশেষ কারণে তিনি আসতে পারেননি। যে হাসপাতাল থেকে তিনি পড়াশোনা করেছেন তার অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “সরকারি হাসপাতালে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হলে নানান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে রাজনীতি রয়েছে, ব্যুরোক্রেসি রয়েছে, অনেকগুলো বাধা পেরিয়ে আসতে আসতে দেরি হয়ে যায়। প্রত্যেক রোগীর প্রাণ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উপত্যকার অবস্থা এমন, যেখানে টাকা থাকলেও চিকিৎসা পরিষেবা সময়মতো পাইয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আমেরিকার মত দেশ প্রায় পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণ করে রেখেছে। অবশ্যই তার খারাপ দিক রয়েছে। আবার কিউবার মত দেশ যেখানে পুরোটাই সরকারি ব্যবস্থা, তারও অনেক খারাপ দিক রয়েছে। ভারতবর্ষে দুই ব্যবস্থা একসঙ্গে চলার মতো পরিস্থিতি রয়েছে, আমাদের সেটাই করতে হবে।”

তিনি শনিবার শিলচরে রোগী দেখেছেন এবং পরবর্তীতে করিমগঞ্জে রোগী দেখে ফিরে যাবেন। তবে আগামীতে বেসরকারি পর্যায়ে উন্নত মানের হৃদরোগ চিকিৎসা পরিষেবা গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পনা রয়েছে তার। এলাকার অন্যান্য চিকিৎসক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে আগামীতে শিলচর শহরে অন্তত পাঁচটি সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কোনও রোগী হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে যাতে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা যায়।

১৯৮৯ সালে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যোগ দিয়েছিলেন ডাঃ নবজিৎ তালুকদার , ১৯৯৫ সালে এখান থেকে পাশ করে বেরোন। এরপর দিল্লি থেকে শুরু করে কোরিয়া, জার্মানি সহ বিভিন্ন জায়গায় উচ্চশিক্ষার জন্য গেছেন। অত্যন্ত ভালো ছাত্র এবং চিকিৎসক হিসেবে বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সম্মান পেয়েছেন। দেশের সেরা হাসপাতালগুলো তাকে নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। তবে তার মনে একটা চিন্তা থাকে, নিজের শহরকে অন্তত কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিতে হবে। তাই বরাক উপত্যকার সফরে এসেছেন। আগামীতে অন্তত মাসে একবার শিলচরে এসে রোগী দেখার ইচ্ছা রয়েছে তার।

Comments are closed.