Barak Bulletin is a hyperlocal news publication which features latest updates, breaking news, interviews, feature stories and columns.
Also read in

Silchar: Lots of Love, Lots of Pride

শিলচর। চার অক্ষরে সমৃদ্ধ। একটি শহরের নাম। কিন্তু আমাদের কাছে শিলচর শুধু নিছক একটি শহর নয়। এক আকাশ ভালোবাসা। এক বুক অভিমান। গর্বে মাথা উঁচু হয়ে যাওয়া। যারা শিলচরে থাকেন তাদের জন্য এটি ‘আমার শহর’। কিন্তু যারা শহর থেকে অনেক দূরে প্রবাসে থাকেন তাদের হৃদয়ের অনেকটা জুড়ে এই শহর শিলচর। কত স্মৃতি, কত আবেগ, কত অনুভূতি! বড় বড় শহরের বড় বড় রাস্তায় সাঁই সাঁই করে গাড়ি ছুটে যাওয়াতেও ততটা আনন্দ নেই, যতটা আনন্দ লুকিয়ে আছে শিলচরের এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় ঝাঁকুনি খাওয়ার মধ্যে। বড় বড় রেস্টুরেন্টও হার মেনে যায় শিলচরের রাস্তার পাশের ফুচকাওয়ালার হাত ডুবানো জলে ফুচকার স্বাদের কাছে।আসলে কর্মসূত্রে কিংবা আরও বিভিন্ন কারণে প্রবাসে থাকলেও জড়টাতো রয়ে গেছে শিলচরেই।শহরটা আজও অস্তিত্বের অনেকটা জুড়ে আছে।

সেই পুরনো দিন, শহরটাকে ঘিরে কত সব পুরনো স্মৃতি! পুরনো দিনের কথা ভেবে কম বেশি সবাই আমরা ভাবুক হয়ে পড়ি।কিন্তু যারা শিলচর থেকে অনেক দূরে থাকেন তারা যেন একটু বেশিই নষ্টালজিক হয়ে পড়েন। সেই পুরোনো দিনের গল্প, শহর ঘিরে অফুরান স্মৃতি, সুখে দুঃখের অফুরন্ত কথা কলম সঙ্গী হয়ে ভাষা খুঁজে পেতে চায়। তাই যারা শহর থেকে দূরে অন্য শহরে কিংবা অন্য দেশে থাকেন তাদের কথা ভেবেই আমাদের এই নতুন কলাম। এখানে নির্বাচিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি অন্যান্যরাও অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তাদের স্মৃতি, শহর ঘিরে অনুভূতি, ভালোলাগা, হারিয়ে যাওয়া কথা আমাদেরকে মেইলের মাধ্যমে লিখে পাঠাতে পারেন।

___________________________________________

বিজয়া পুরকায়স্থ
গৃহিনী
বৃহত্তর নয়ডা
উত্তরপ্রদেশ

শিলচর হলো আমার বুকে একরাশ চিনচিনে ব্যথা। সেই ব্যথায় কষ্ট আছে, বিরহ আছে , আর আছে এক আকাশ ভালবাসা।
শিলচর বললেই মনে আসে গান্ধীমেলা। টানা একমাস চলত। আর চার পাঁচবার অন্তত মেলায় যাওয়া চাই ই চাই। মা বাবার সাথে, মাসীপিসীর সাথে, বন্ধুদের সাথে আর একটা স্পেশাল দিন দেখে ওর সাথে…সেদিন শুধু দুজন। সেকি উত্তেজনা.. কেউ না দেখে ফেলে। চেনা কাউকে দেখলেই দুজনে ছিটকে অন্যদিকে চলে যাওয়া আর মিথ্যে কথা বলা…” ঐ তো, বন্ধুরার সঙ্গে আইসি। এই ভিড়ে কে যে কই গেছে পাইরামই না খুঁজিয়া। ” ওহ, কি দিন ছিল ! নাগরদোলার লম্বা টিকিট নিয়ে আমরা বন্ধুরা বসতাম। এক চক্কর শেষ হলেই আবার একটা টিকিট দিতাম..ফের একটা চক্কর। সবাই মিলে সেকি চিৎকার আর হাসি। আর ওর সাথে নাগরদোলায় বসলে অপেক্ষা করতাম কখন একদম ওপরে উঠবো …তখন নীচে পুরো শিলচর আর আমরা দুজন শুধু ওপরে। তখন আবার চিৎকার টিৎকার করতাম না…প্রেমিকাদের কি ঐ বিভৎস ভাবে চিৎকার করা মানায়? তখন নকল ভয়ে নেকু হয়ে যেতাম। ওর ঘাড়ে মাথা ফেলে, হাতটা জোরে চেপে নাগরদোলা চড়তাম। কি আদিখ্যেতা ছিল বাবা। মৌত কী কুয়া, বিদ্যুত কন্যা এসব হাঁ করে দেখতাম। আর কোনো ধুলো ভরা দোকানে চাট ঘুঘনি খেতাম। তাতে বালি কিড়কিড় করলেও দোকানদারদের চার কথা শোনাতাম না। পেট খারাপ হলেও পরেরদিন ঐসব দোকানে আবার খেতাম। শরীর নিয়ে পুতুপুতু তখন মনে হয় কারোর ছিল না।

ছোটবেলায় রিকশা চড়া মনে পড়ে। মা বাবা সীটে বসতেন আর আমি আর বোন নীচে উবু হয়ে বসতাম। রিকশাওয়ালার পশ্চাতদেশের নড়াচড়া দেখে আমি আর বোন হাসিতে ফেটে পড়তাম কিন্তু কখনও মনে হয়নি বাবা আরেকটা রিকশা

নিলেন না কেন ? তখন যুগ এমনি ছিল। ধনী গরীবের এক নিয়ম। সন্ধ্যে হলে রিকশাতে কেরোসিনের লাইট জ্বালানো হতো। তখন জিজ্ঞাসা করলে রিকশাওয়ালা বলতো ..” না আইজ্ঞা যাইতাম না। লেফটন ইগু জ্বালাইতে লাগব নু। ” সত্যি এসব মনে পড়লে চোখে জল আসে।

আজ এতো বছর বাদেও প্রতিদিন একবার হলেও শিলচরের কোনো ঘটনা বা গল্প আমরা বাড়িতে আলোচনা করি। সেখানকার স্কুল ,কলেজ,পাড়ার অলিগলি, মিশনে যাওয়া, ওরিয়েন্টাল সিনেমা হলে সিনেমা দেখা, অন্নপূর্ণা হলে ওপরতলার সাইডের সীটে বসে ঘাড় বাঁকা করে সিনেমা দেখা, দেবদুতে টিকিটের লাইনে ব্ল্যাকারদের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে টিকিট কাটা…কতো বলব ? পুজোতে শেলী সিনহার অর্কেষ্ট্রার স্মার্ট গান, ডিস্ট্রিক্ট লাইব্রেরিতে হোল নাইট ক্ল্যাসিকাল প্রোগ্রাম দেখা…উফফ্ পুরো স্বপ্ন! তখন মায়ের সাথে সেন্ট্রাল রোডে বাজার করতে যাওয়া মানে মনে হতো প্যারিসে বাজার করতে এসেছি। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বাজার। শিল্পভারতী যেন শ্রেষ্ঠ দোকান। আজকালকার মতো ঝাঁ চকচকে দোকান নয় কিন্তু একটা মায়ামাখানো দো কান যেন । পিয়াসী তে এক প্লেটে রসগোল্লা আর সিঙারা খেতাম। রসগোল্লার রস লাগানো ঐ সুস্বাদু সিঙারা এই ভূভারতে আছে কিনা সন্দেহ ।

বৃষ্টির দিনে টিনের চালে ঝমঝম করে জল পড়ার শব্দ আমি যেন এখনও শুনতে পাই। মা রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে খেতে ডাকতেন আর আমরা ছাতা মাথায় এক একটা ইটে সাবধানে পা ফেলে ফেলে উঠোন পেরিয়ে খেতে যেতাম। এই রোমাঞ্চ আজকের মডিউলার কিচেনে কোথায় ? আসাম টাইপের বাড়িগুলো শিলচরের এক একটা রত্ন ছিল। ছিমছাম লাগতো। মানুষজনের মধ্যে কত আন্তরিকতা ছিল। প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। পাড়ার জ্যেঠু, কাকু, দাদারা গার্জিয়ান ছিল। আমরা ওদের ভয় পেতাম, কথা শুনতাম, মান্যি করতাম। গাড়িঘোড়া কম। মাল আসতো ঠেলাগাড়িতে করে। অসমিয়া স্কুলের উল্টোদিকে আমাদের কোয়ার্টার ছিল। সারাদিনই শুনতাম ঠেলাগাড়ি যাচ্ছে…দম লাগাকে হেইয়া , আরো জোরে হেইয়া , রায়বাহাদুর হেইয়া, দো ধাক্কা হেইয়া।

বড় দুঃখ হয় এখন আমার প্রিয় শিলচরকে দেখলে। আমার কাছে শিলচরের গল্প শুনে আমার নতুন বন্ধুদের শিলচরে আসার খুব ইচ্ছে । ওরা শিলচরকে কি জানি কি ভাবে। ভাবে বোধহয় দারুণ সুন্দর, স্বপ্নের মতো একটা জায়গা। কিন্তু আমি ওদের শিলচর আনতে চাইনা। চাইনা আজকের এই জঞ্জালময় শহরটাকে দেখাতে। আমি আমার ছোটবেলার চোখ দিয়ে শিলচরের যে স্বপ্নটা ওদের দেখিয়েছি সেই স্বপ্ন নিয়েই থাকুক ওরা..স্বপ্ন ভেঙে কাজ নেই।

___________________________________________

মঞ্জরী দত্ত
গৃহিনী
থানে , মহারাষ্ট্র

আমার শহর ‘শিলচর’ এই শব্দটা আমার প্রায় সবটুকুই জুড়ে আছে । ভালোলাগা ভালোবাসার সাথে এক অদ্ভুত মনকেমন । আমার ছোটবেলা বড়বেলার অনেকটাই ওখানে । শিলচরের সবকিছুই খুব মনে পড়ে । সবচেয়ে যেটা প্রথমেই মনে পড়ে , সেটা হচ্ছে আমার স্কুল । শিলচর সরকারি উচ্চতর বহুমুখী বালিকা বিদ্যালয় । স্কুলে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আমার আজও মনে পড়ে । স্কুলের সেই তেঁতুল গাছ , মহেশ দার বানানো আচার,ক্যান্টিনের সেই নানখাতা বিস্কুট,ফুচকাওয়ালার ফুচকা সব । ফুচকাওয়ালার কথা বলতেই মনে পড়ল , আমাদেরই কোন এক সহপাঠিনী টিফিন টাইমে কানামাছি খেলতে খেলতে, খেলার সঙ্গিনী দের ভেবে,ফুচকাওয়ালাকে ধরে ফেলেছিল । আমাদের হাসি আর কে দেখে !স্কুলের মেইন গেটের সামনে বরফওয়ালা বসত । সাদা, কমলা এসব নানা রঙের বরফ কিনে খেতাম । আবার অনেকে তার মধ্যে মহেশ দার তেঁতুলের আচার লাগিয়ে খেত । আহা!! সে যেন অমৃত! স্কুলের কথা বলব আর টীচারদের কথা বলব না ,তা কি হয়!সব টীচার দের কথা আজও মনে পড়ে । বিশেষতঃ শান্তি দি । আমাদের বাংলা পড়াতেন । উনি বোধহয় সব ছাত্রীদেরই প্রিয় ছিলেন । স্কুলের পর জি সি কলেজ । অফ্ পিরিয়ডে বিবেক সুইটসে বসে আড্ডা । সাথে পরোটা ঘুগনি, নয় সিঙ্গারা । আর ছিল কলেজে ক্লাশে বসে তিন জন বান্ধবী মিলে খাতার পেছনে লেখা । ক্লাশে তো আর কথা বলতে পারতাম না , তাই খাতার পেছনে যার যেটা বক্তব্য লিখতাম । সিলেটি ভাষায় কথাগুলো ছিল, কিন্তু লিখতাম ইংলিশে । বৃষ্টি পড়লে তারপরের দিন কলেজ আসব কিনা এটা ছিল এক বিরাট চিন্তার বিষয় ।

শিলচর বললেই অনেকের মত আমারও মনে আসে গান্ধীমেলা । প্রতি বছর মেলায় অন্ততঃ পাঁচ /ছ বার যাওয়া চাই ই চাই । মেলায় গিয়ে কিছু কিনি বা না কিনি ,ঐ হজমি গুলি আর চাট খেতামই । বিয়ের পরও যতদিন শিলচর ছিলাম আর কিছু না হোক এক চক্কর ঘুরে তারপর জিলিপি কিনে বাড়ি ফিরতাম ।

বাড়ির সামনেই হত পূজো প্যান্ডেল । হত কেন বলছি , এখনও হয়। পাড়ার পূজো , ঢাকের আওয়াজ —উফফ্ সে কী আনন্দ! কত কত পুজোর জামা । দোকান ঘুরে ঘুরে পূজোর কাপড় কেনা । এখন বড় শহড়ে থাকি ঠিকই , কিন্তু পুজোর কোনো আনন্দ পাই না । আলোর রোশনাই আছে ঠিকই কিন্ত মনের আনন্দ পাই না । নিজের ভালোবাসার শহরে যাই কি না যাই , পুজোর কটা দিন মন ঠিক পড়ে থাকে ওখানেই ।

শিলচর বললে কিন্তু আমি বরাকের রুইও বুঝি । কি তার স্বাদ আহা ! ভেবেই জিভে জল । প্রচুর মাছ আসত বাড়িতে , তারমধ্যে বরাকের রুই তো আসতই। এখন যেখানে থাকি , এখানেও খুব ভাল মাছ পাই । রান্না করি সব ধরণের । সবাই বলে বাহ্ । জিভ বলে ভালোই। তবে মন বলে , নাহ্ ঠিক ঠিক হল না । বরাকের রুই এর আরও অনেক স্বাদ। জন্মদিনে বাড়িতে কেক আসত। এখনকারের মত তো আর ব্ল্যাক ফরেষ্ট , রেড ভেলভেট এসব ছিল না । চৈতালী ফুড সেন্টার বা সুরুচি এই দুটোর মধ্যে একটা থেকে কেক আসত। কি আনন্দ ছিল তাতেই।

বড্ড ছোট্ট হতে মন চায় এখন । ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার মধ্যে যা কিছু ফাঁকি রয়ে গেছে , তার সবটুকুকে পুষিয়ে নিয়ে আবার বড় হতে ইচ্ছে হয় । শিলচর শহরের মেয়ে !! শুনলে অনেকেই বলে ,ও বাঙাল মেয়ে ! সিলেটি নাকি ! তোমাদের ওখানে তো আবার ‘প’কে ‘ফ’ উচ্চারণ করে । যেমন ‘ফুলিশ স্টেশন’, ‘ফুলকফি’ । ‘চোর’কে ‘চুর’ —শুনলে আমার খুব রাগ হয় । আমার শহর নিয়ে কেউ কিছু বলুক ,আমি তা মোটেও পছন্দ করি না। আমিও দু-চার কথা শুনিয়ে দেই । আমার শহরের সব ভালো । ওখানকার লোকেদের মধ্যে আতিথেয়তাই আলাদা । আন্তরিকতা অনেক বেশি । কিন্তু ,রাস্তাঘাটের উন্নতি ঠিক এখনও তেমন না । সারা শহরেই জল জমে । রাস্তাঘাটে আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। এই জিনিষগুলো আমি ঠিক মানতে পারি না । তা সত্ত্বেও বার বার ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে হয় নিজের শহরে । মনে হয় , অন্ততঃ কয়েকটা দিন সব ‘সুজন’ আর ‘স্বজন’দেরে ঘিরে থাকি । হোক না যত আবর্জনা ,জমা জল। এশহর কে ভুলি কি করে ! এ শহর যে আমার ভালোবাসার পিছুটান ।

Comments are closed.